চাল, ডাল বা ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম মেটাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত ক্রেতারা এখন কৃচ্ছ্রসাধন করছেন। একসময়ের জনপ্রিয় ‘ফ্যামিলি প্যাক’ বা বড় আকারের প্যাকেটগুলো এখন মুদি দোকানের তাকে শোভাবর্ধক হিসেবে পড়ে থাকছে, আর অবিক্রীত প্যাকের জায়গা দখল করে নিচ্ছে স্মল বা ছোট প্যাক এবং ‘মিনি প্যাক’ কিংবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এসকেইউ (স্টক কিপিং ইউনিট)। মূলত পকেটে নগদ টাকার অভাব এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে ক্রেতারা এখন মাসব্যাপী মজুদের পরিবর্তে ‘যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু’ নীতিতে ঝুঁকছেন।
দ্রুত বিক্রি হয়, দামও তুলনামূলক সস্তা এবং বারবার কিনতে হয়—এ ধরনের বিভিন্ন খাদ্য, সাবান, ডিটারজেন্ট, ওষুধপণ্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস (এফএমসিজি) হিসেবে। খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বাজারে এফএমসিজি পণ্যগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে একটি খাদ্যশ্রেণীর ভোগ্যপণ্য, অন্যটি নন-ফুড বা খাদ্যবহির্ভূত ভোগ্যপণ্য।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের এফএমসিজি বাজারের আকার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। প্যাকেটজাত খাদ্য, পানীয়, কসমেটিকস ও হোম কেয়ার পণ্যের এ বিশাল বাজারে আগে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, এ খাতের প্রবৃদ্ধি এখন পুরোপুরি মূল্যনির্ভর। অর্থাৎ পণ্যের ব্যবহার বাড়ার কারণে বাজার বড় হচ্ছে না, বরং কাঁচামাল ও ডলারের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হওয়ায় বাজারে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে পণ্যের ভলিউম বা পরিমাণের হিসাবে প্রবৃদ্ধি এখন স্থবির বা নেতিবাচক।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর, নতুন বাজার ও রামপুরার মতো বড় বাজার থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে এক নতুন চিত্র। আগে যে পরিবার মাসে এক কেজি গুঁড়ো দুধ বা দুই কেজির ডিটারজেন্ট কিনত, তারা এখন ৫ বা ১০ টাকার মিনি প্যাক খুঁজছে। এমনকি বিস্কুট, নুডলস বা পানীয়র ক্ষেত্রেও ৫০০ গ্রামের পরিবর্তে ২০ বা ৩০ টাকার ছোট প্যাকের কাটতি সবচেয়ে বেশি।
ভোক্তা আচরণের এ পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে ‘আর্থিক হার্ডশিপ’ বা অনটন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তারা এখন একবারে বড় অংকের টাকা খরচ করতে ভয় পাচ্ছেন। একজন সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী এখন ১ হাজার টাকা খরচ করে একটি বড় লোশন বা শ্যাম্পু কেনার চেয়ে ২০ টাকার মিনি প্যাক কেনাকে নিরাপদ মনে করছেন। এতে তার পকেটে থাকা বাকি ৯৮০ টাকা তাকে এক ধরনের মানসিক সুরক্ষা প্রদান করে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, ম্যানুফ্যাকচারারদের জন্য ৫, ১০ বা ২০ টাকার এ ‘পাওয়ার প্রাইস পয়েন্ট’ ধরে রাখা এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ২১টি বহুজাতিক কোম্পানি এফএমসিজি খাতে সক্রিয় রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় করপোরেট জায়ান্টদের (যেমন প্রাণ-আরএফএল, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, আকিজ ইকোনমিক জোন) সঙ্গে তাদের তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। স্থানীয় কোম্পানিগুলো তৃণমূল পর্যায়ে ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতার কারণে বাজারের ছোট ছোট প্যাকেটজাত পণ্যের চাহিদা দ্রুত লুফে নিচ্ছে। অন্যদিকে, গত তিন দশকে শক্ত অবস্থান তৈরি করা ‘প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল’-এর মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এ খাতের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
এফএমসিজি পণ্যের অন্যতম বড় সরবরাহকারী দেশীয় কোম্পানি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তাদের তথ্যমতে, দুই বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটিতে ছোট প্যাকের অবদান বেড়েছে ১৩ শতাংশ। নুডলসে দুই বছর আগেও সিঙ্গেল বা ছোট প্যাকের কন্ট্রিবিউশন ছিল ১২ শতাংশ। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে। ছোট প্যাকের বিস্কুটের কন্ট্রিবিউশন ছিল ১২ শতাংশ। এখন সেটি পাঁচ গুণ বেড়ে হয়েছে ৬০ শতাংশ। দুই বছর আগেও পাউডার দুধের অবদান ছিল ৭০ শতাংশ, যেটি বেড়ে বর্তমানে ৮৮ শতাংশ। ৮০ মিলিগ্রামের সরিষার তেলের কন্ট্রিবিউশন দুই বছরে ৭০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে। প্যাকেটজাত এক কেজি চালের অবদান দুই বছরে ৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬০ শতাংশ। এক কেজি সুগন্ধি চালের কন্ট্রিবিউশন ছিল ৯২ শতাংশ, বর্তমানে তা ৯৮ শতাংশ।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দেশে শুরুর পর থেকেই ফ্যামিলি প্যাকে ছোটগুলোর চাহিদা বেড়েছে। ভোক্তারা বড় প্যাকের চেয়ে ছোট ছোট প্যাক বেশি কিনছে। ৫, ১০ বা ২০ টাকার প্রাইস পয়েন্টের পণ্যগুলোর চাহিদা বেড়েছে। বিগত দুই বছরে আমাদের ওভারঅল স্মল প্যাকের অবদান বেড়েছে ১৩ শতাংশ।’
তিনি আরো বলেন, ‘এফএমসিজি খাতের প্রবৃদ্ধি এখন পুরোপুরি মূল্যনির্ভর। কাঁচামাল ও ডলারের দাম বাড়ার কারণে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হওয়ায় বাজারে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ভোক্তাদের ধরতে খুবই সীমিত মুনাফায় পণ্য বাজারে ছাড়তে হচ্ছে। এছাড়া দাম অপরিবর্তিত রেখে পণ্যের ওজন কমিয়েও বাজারে টিকে থাকার লড়াই চালাতে হচ্ছে। কারণ দাম বাড়লে ভোক্তার ওপর আবার চাপ বাড়বে। এভাবেই এফএমসিজি খাত চলছে।’
এফএমসিজি পণ্যের সরবরাহকারী দেশীয় কোম্পানি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি (এমজিআই)। তাদের পণ্যের মধ্যে আটা-ময়দা, পাউডার দুধ, বিস্কুট, চা, কোমল পানীয়, বোতলজাত পানি, চিনি অন্যতম। এমজিআই সূত্রে জানা গেছে, আগে মোট বিক্রিতে ৫০০ বা ৪০০ গ্রাম পাউডার দুধের ফ্যামিলি প্যাকের অবদান ছিল ৭০ শতাংশের মতো, এখন তা ৬০ শতাংশের নিচে। ২০২৪ সাল থেকে ছোট এসকেইউর (১০/২০ টাকার প্রাইস পয়েন্ট) পাউডার দুধের কনভারসন বেড়ে এখন প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ।
ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা না বাড়া, বিপরীতে পণ্যের দাম বাড়ায় প্যাকের আকারও ছোট করতে হয়েছে। মেঘনা গ্রুপ জানায়, আগে তাদের মিল্ক পাউডারের ছোট প্যাক ছিল ২৫ গ্রামের। এখন সেটি কমতে কমতে ১০ টাকা প্রাইস পয়েন্টে চলে এসেছে। ক্রেতা ধরতে পাঁচ গ্রামেরও দুধ রয়েছে তাদের। শুধু তা-ই নয়, আগে ৭৫ গ্রামের প্যাক ছিল, এখন ৫০ গ্রামেরও প্যাক আনা হয়েছে।
বিশুদ্ধ পানি, কোমল পানীয়, চা, বিস্কুটের বাজারেও একই প্রবণতার কথা জানিয়েছে এমজিআই। করোনা-পরবর্তী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। তখন ইন্ডাস্ট্রিতেও একটা পরিবর্তন আসে। পুরো ইন্ডাস্ট্রি শ্রিংকফ্লেশনের মধ্য দিয়ে যায়। এমজিআই জানায়, আগে ১০ টাকায় প্রায় ৭০ গ্রাম বিস্কুট দিলেও এখন সেটি ৩৫-৪০ গ্রামে নেমেছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় যেসব এসকেইউর মূল্য ৫০ টাকা বা তার বেশি সেগুলোর চাহিদা কিছুটা কমেছে। বিপরীতে ১০ বা ৫ টাকা মূল্যের পণ্যের ভোগ বাড়ছে। এনার্জি ড্রিংক মার্কেটেও ৩০ টাকার ২৫০ মিলি পণ্যের চেয়ে ২০০ মিলির ২০ টাকার পণ্যটির চাহিদা বেড়েছে। চায়ের ক্ষেত্রে ৪০০ গ্রামের ফ্যামিলি প্যাকের চাহিদা বড় আকারে কমেনি। তবে একই প্যাক দিয়ে আগে একটি পরিবার এক মাস চললেও এখন একই প্যাক দিয়ে এক মাসের বেশি সময় চালাচ্ছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় লাভ না থাকলেও শুধু মার্কেট শেয়ার ধরে রাখতে কোম্পানিগুলো পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম অপরিবর্তিত রাখছে, যেটি বিশ্বজুড়ে শ্রিংকফ্লেশন হিসেবে পরিচিত।
ফ্যামিলি, স্মল ও মিনি প্যাকেটজাত পণ্য বিক্রয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এমজিআইয়ের হেড অব অ্যাকাউন্টস এসএম মুজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে স্মল বা মিনি প্যাকের বিক্রি বেড়েছে এমনটা নয়। তবে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বেড়েছে। যেমন গুঁড়ো দুধের ২৫ বা ৭৫ গ্রামের প্যাকগুলোর বিক্রি বেড়েছে। ৫/১০ টাকার এসকেইউর বিক্রি বেড়েছে। ১০ টাকার ইনস্ট্যান্ট নুডলস প্যাকেটের বিক্রি বেড়েছে। কারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে তারা ব্র্যান্ডেড পণ্যের পরিবর্তে এখন অনেক ক্ষেত্রে খোলা পণ্য বা নন-ব্র্যান্ডেড সস্তা পণ্যের দিকেও ঝুঁকছেন।
অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করছে বর্তমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি আয়ের মানুষের হাতে নগদ প্রবাহ বৃদ্ধির ওপর।
এফএমসিজি পণ্যের ছোট প্যাকের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি সরজমিনেও উঠে এসেছে। গতকাল কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন ২৩ বছর বয়সী নিলুফা ইয়াসমিন। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে গত বছরের শেষ দিকে ২৫ হাজার টাকা বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পড়ালেখা করার সময় সাবান, শ্যাম্পু, কসমেটিকস বড় প্যাকই কিনতাম। একটি কিনলে দীর্ঘদিন চলে যেত। তখন পরিবার থেকে খরচ দিত। এখন নিজের খরচে চলতে হয়। বাসা ভাড়া, গাড়ি ভাড়া, খাওয়া-দাওয়াসহ অন্যান্য খরচ বেড়েছে। এখন বোতলের বদলে মিনি প্যাক শ্যাম্পু ব্যবহার করি। বড় প্যাকেটের নুডলসের চেয়ে ৫০ বা ৬০ টাকার মধ্যের প্যাকগুলোই কিনি। অন্যান্য পণ্যও এভাবে ছোট প্যাকগুলোই কিনি। একবারে অনেক কিনে আর্থিক চাপ তৈরির চেয়ে যখন যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই কিনি। এটা শুধু আমি না, আমার মনে হয় নিম্ন আয়ের সবাই-ই করেন।’
ভাটারা নতুন বাজারের রাইফা স্টোরের দোকানি বলেন, ‘তেল, গুঁড়ো দুধ, বিস্কুট, নুডলস, সাবান, শ্যাম্পুর মতো পণ্যের বড় প্যাকের ক্রেতা কম। ১০, ২০ বা ৫০ টাকার পণ্যের বিক্রি ও চাহিদা বেশি। একই ক্রেতা একই পণ্য কিনতে দুই-তিনদিন পরই দোকানে আসেন।’
কারওয়ান বাজারের একটি চালের দোকানের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ আগে একসঙ্গে বেশি করে চাল কিনত। চাকরিজীবীদের অনেকেই আমাদের দোকান থেকে একসঙ্গে পুরো মাসের চাল কিনত। এখন এমন ক্রেতার সংখ্যা অনেক কমেছে। খুচরা চাল কেনার ক্রেতা বেড়েছে।’
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এফএমসিজি খাতে এখন যে ‘মিনি প্যাক’ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য স্বাস্থ্যকর নাও হতে পারে। কারণ এতে মাথাপিছু প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড লয়্যালটি নষ্ট হচ্ছে। তবে বর্তমানের এ সংকটকালে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোর জন্য ‘মিনি প্যাক’ বা ‘স্মলার এসকেইউ’ উৎপাদন ছাড়া কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি এফএমসিজি খাতের আরো তিনটি বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড ও ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। এফএমসিজি খাতের ভোক্তাদের ক্রয়প্রবণতা পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই বছর ধরেই ভোক্তাদের মধ্যে বড় প্যাকের তুলনায় তুলনামূলক ছোট আকারের প্যাক কেনার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। মূলত মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসার পাশাপাশি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের কথা যদি বলি তাহলে গত প্রান্তিক ও চলতি প্রান্তিকে কিছুটা বড় আকারের প্যাক আমরা বিক্রি করতে পেরেছি। ফলে ভোক্তাদের প্রবণতার ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলা যায়। অবশ্য এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে জাতীয় নির্বাচন ও ঈদের ছুটির কারণে আমাদের পণ্য বিক্রির পরিমাণ কমেছে। তবে এ মাসে এখন পর্যন্ত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।’
বাংলাদেশের এফএমসিজি খাতের বর্তমান চিত্রটি মূলত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিরই দর্পণ। মানুষ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার প্রয়োজনেই হিসাবি হয়ে উঠছে। বড় প্যাকের জৌলুস কাটিয়ে ছোট প্যাকেটেই এখন ভরসা খুঁজছে কোটি পরিবার। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহায়তা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে এ খাতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি উভয়ই ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্য সংকট মানুষের জীবনযাপন ব্যয় বাড়িয়েছে। বিগত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। কিন্তু চাকরিজীবীদের আয় না বাড়লেও পণ্য ঠিকই কিনতে হচ্ছে। সেজন্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আয় মেলাতে গিয়ে খরচে কাটছাঁট করছেন। মিনি প্যাকের পণ্য ক্রেতাদের অধিকাংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। তারা কারো কাছে হাত পাততেও পারেন না। সেজন্য তারা খরচ কমাতে ও জীবনযাপন পরিবর্তনে বাধ্য হন। বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার ভুক্তভোগী। ভোক্তাদের ক্ষয়ক্ষমতা একটি দেশের অর্থনীতির অনেক চিত্রকে তুলে ধরে। দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে। সেটি সরকারের পক্ষে একা সম্ভব না। বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান। সেজন্য এখানে নীতিসহায়তা দিতে হবে। কাজ করার সুষ্ঠু ও নিরাপদ পরিবেশ দিলে অর্থনীতির আকার বড় হবে। মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়বে।’